ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ , ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুদানে প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় নিহত ১৫৩

অনলাইন ডেস্ক
৩ ঘন্টা আগে
সুদানে প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় নিহত ১৫৩
সুদানের সেনাবাহিনীর ড্রোন হামলায় বিতর্কিত আবিয়েই অঞ্চলের একটি বাজারে ১৫৩ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছেন।

সোমবারের এ হামলায় আগুনে পুড়ে বহু মানুষের মরদেহ নষ্ট হয়ে গেছে। এখনো উদ্ধারকাজ চলায় নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত কয়েক দিনের হামলায় সুদানে নিহতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। এতে জড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি শক্তিও।

আবিয়েই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত তথ্যমন্ত্রী ইয়োহানা আকোল এনগর মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সোমবার বাজারে হামলায় প্রথমে ৭৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরে এ সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ হয়।

তিনি বলেন, ‘আগুন এখনো জ্বলছে। তাই নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের কাজও চলছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ।’ আগুনে কয়েকজনের মরদেহ পুরোপুরি পুড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে ধারণ করা একটি ভিডিও যাচাই করেছে রয়টার্স।

এতে পুড়ে যাওয়া ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন এবং ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। বাসিন্দারা ক্ষয়ক্ষতি দেখার সময়ও একটি ভবনে আগুন জ্বলছিল। হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন এনগর। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্স সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিনজন কূটনীতিক, একজন ত্রাণকর্মী ও সংঘাতবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে জানান, হামলায় বাজারের একটি জ্বালানি ডিপোতে আঘাত হানা হয়। তাদের ভাষ্য, অতীতে আরএসএফের সেনাদের জ্বালানি সরবরাহের কাজে ডিপোটি ব্যবহার করা হতো। এ বিষয়ে আরএসএফের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

২০১১ সালে সুদান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দক্ষিণ সুদান। এর পর থেকে তেলসমৃদ্ধ আবিয়েই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলছে। অঞ্চলটি যৌথভাবে পরিচালিত হয়। এর সীমান্ত রয়েছে সুদানের কর্দোফান অঞ্চলের সঙ্গে। বর্তমানে কর্দোফান সুদানের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংঘাতপূর্ণ এলাকা। সুদানের সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, আবিয়েইয়ের কয়েকটি এলাকায় আরএসএফ সক্রিয় রয়েছে। তবে ওই অঞ্চলে আরএসএফের উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেছেন এনগর। এসব দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী আবিয়েই নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ) গত মে মাসে সতর্ক করে বলেছিল, ওই অঞ্চলে আরএসএফের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অঞ্চলটির চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে দেরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও জাতিসংঘের কর্মীরা ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও জানায় সংস্থাটি। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক আবিয়েইসহ বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘সুদানজুড়ে একের পর এক ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আমরা এখনো গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তিনি আরো বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের ক্ষতি সামলাতে হিমশিম খাওয়া মানুষের ওপর এসব হামলা ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।

এনগর জানান, হামলার পর বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকর্মীরা মরদেহ উদ্ধারে সমস্যায় পড়ছেন। সোমবারের হামলার কারণে প্রায় আট হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান তিনি। দক্ষিণ সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার গভীর রাতে জানায়, আবিয়েই শহরের উত্তরে একটি বাজারে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে হতাহত ব্যক্তিদের সংখ্যা জানায়নি মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে সুদানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি পরপর পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। এরপরই জ্বালানির বাজারটিতে আগুন ধরে যায়। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘মানুষ আহতদের সরিয়ে নিতে শুরু করে। তাদের পেট ও পায়ে বিস্ফোরণের টুকরার আঘাত লেগেছিল। একটি জায়গায় আমি আগুনে পুড়ে যাওয়া ২৮টি মরদেহ দেখেছি।’ বাজারে আরএসএফ বা অন্য কোনো বাহিনীর ইউনিফর্ম পরা যোদ্ধা তিনি দেখেননি বলেও জানান ওই প্রত্যক্ষদর্শী। বাজারটিতে চিনি, ময়দা ও বিস্কুটের মতো পণ্য বিক্রি হতো। এসব পণ্য সুদানে পাঠানো হয়।

সম্প্রতি সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ড্রোন হামলা বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিয়ালা শহর এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরেও হামলা হয়েছে। স্থানীয় জরুরি সাড়া প্রদানকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সুদানের পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যে ড্রোন হামলায় প্রায় ৮৪ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হন। রাজ্যটির বড় অংশ আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সোমবার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরে একাধিক ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে চার শিশু নিহত হয়।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিয়ালা শহরের একটি বাজারে হামলায় ২৩ জন নিহত ও ৪৪ জন আহত হন। চাদের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, সুদানের সেনাবাহিনী তাদের ভূখণ্ডেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, চাদের ভূখণ্ড নিয়মিতভাবে আরএসএফের রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত আগস্টের শেষ দিকে জানিয়েছিল, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী কাজ করছে। গত ১০ অক্টোবর সুদান ও মিসরের সীমান্তের কাছে এক বিমান হামলায় ৭০ জনের বেশি খনিজ উত্তোলনকারী শ্রমিক নিহত হন বলে জানিয়েছে একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা।

আবিয়েই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই সহিংসতা চলছে। এসব সংঘর্ষে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক হামলাটিকে কয়েক বছরের মধ্যে অঞ্চলটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যসেবারও ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ সুদানের সরকার জানিয়েছে, প্রতিবেশী সুদানের যুদ্ধে তারা কোনো পক্ষ নেয়নি। তবে কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, আরএসএফের রসদ সরবরাহের জন্য আবিয়েই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে অঞ্চলটির ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রন্তিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, কাছের আমেথ বেক হাসপাতালে তারা ২০ জনের বেশি আহত ব্যক্তির চিকিৎসা দিচ্ছে। তাদের কয়েকজন আগুনে পুড়ে আহত হয়েছেন।

হাসপাতালটিতে এমএসএফের চিকিৎসা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডাউয়ার বলেন, ‘আমরা অস্ত্রোপচার, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি।’ এমএসএফের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার সময় ব্যান্ডেজ বাঁধা কয়েকজন রোগী হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে আছেন। সূত্র: রয়টার্স


কমেন্ট বক্স